ওজোন স্তর কী?
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬–৩৫ km উচ্চতায়
ওজোন গ্যাসের একটি ঘন স্তর থাকে, যাকে ওজোনোস্ফিয়ার (Ozonosphere)
বলে। সর্বোচ্চ ঘনত্বের ওজোন সাধারণত প্রায় ২০–৩০ km উচ্চতায় পাওয়া যায়।
বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯০% ওজোন এই স্তরেই থাকে।
ওজোনের ঘনত্ব ডবসন ইউনিট (Dobson Unit বা DU)-এ মাপা হয়।
ওজোন স্তরের উৎপত্তি
সূর্য থেকে আসা কম-তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনি (UV) রশ্মি স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে
উপস্থিত অক্সিজেন অণু O₂-কে ভেঙে দুটি অক্সিজেন পরমাণু
O-তে পরিণত করে।
ধাপ ১: অক্সিজেন অণুর ভাঙন
O₂ + UV রশ্মি → O + O
এরপর উৎপন্ন অক্সিজেন পরমাণু একটি অন্য অক্সিজেন অণু O₂-এর
সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওজোন অণু O₃ তৈরি করে।
ধাপ ২: ওজোনের সৃষ্টি
O + O₂ → O₃
এই সৃষ্টি ও পুনরায় ভাঙনের বিক্রিয়াচক্র নিরন্তর চলতে থাকে। ওজোন অণুও
অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে ভেঙে আবার অক্সিজেনে পরিণত হয়। এই চলমান
আলোক-রাসায়নিক ভারসাম্য-এর ফলেই স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ওজোনের
পরিমাণ মোটামুটি স্থির থাকে।
ওজোন স্তরের অবক্ষয়
প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে ওজোন স্তর ক্রমশ পাতলা হয়ে যাচ্ছে।
এই ঘটনাকে ওজোন স্তরের অবক্ষয় (Ozone Depletion) বলে।
১. সূর্যরশ্মির ভূমিকা
অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রায় 208 nm সূর্যরশ্মি,
যাকে UV-C বলা হয়, সরাসরি ওজোন অণু ভেঙে দিতে পারে।
O₃ → O₂ + O
উৎপন্ন অক্সিজেন পরমাণু আবার ওজোনের সঙ্গে বিক্রিয়া করতে পারে:
O₃ + O → 2O₂
২. CFC-এর ভূমিকা
রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার ও এরোসল স্প্রেতে ব্যবহৃত
ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) বাষ্পীভূত হয়ে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে
পৌঁছায়। সেখানে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে CFC ভেঙে সক্রিয় ক্লোরিন পরমাণু
তৈরি করে।
CFCl₃ + UV রশ্মি → Cl + CFCl₂
এই সক্রিয় ক্লোরিন পরমাণু একের পর এক ওজোন অণু ভাঙতে থাকে।
Cl + O₃ → ClO + O₂
ClO + O₃ → Cl + 2O₂
শেষ ধাপে ক্লোরিন পরমাণু আবার মুক্ত অবস্থায় ফিরে আসে এবং পুনরায় অন্য
ওজোন অণু ভাঙতে থাকে। তাই সামান্য পরিমাণ CFC থেকেও বিপুল পরিমাণ ওজোনের
ক্ষয় হতে পারে।
৩. NO ও NO₂-এর ভূমিকা
বিমান ও শিল্পকারখানার নির্গমন থেকে সৃষ্ট
নাইট্রিক অক্সাইড (NO) এবং
নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (NO₂) ওজোন অণুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে
তা ভেঙে দেয়।
NO + O₃ → NO₂ + O₂
NO₂ + O₃ → NO + 2O₂
দ্বিতীয় ধাপের শেষে NO আবার মুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ NO-এর পরিমাণ কমে না,
অথচ ওজোন অণু ক্রমাগত বিয়োজিত হতে থাকে।
সহজে মনে রাখার উপায়
তিনটি কারণের ক্ষেত্রেই মূল ধারণাটি একই:
- একটি সক্রিয় কণা ওজোন ভাঙে।
- এরপর সেই কণা আবার মুক্ত হয়ে যায়।
- তারপর একই কণা বারবার ওজোন ভাঙতে পারে।
এই ধরনের বিক্রিয়াকে চক্রাকার বা Catalytic Reaction বলা হয়।
একটি চাবি দিয়ে যেমন বারবার তালা খোলা যায়, তেমনই একটি Cl বা NO কণা
অনেকগুলি ওজোন অণু ভাঙতে সক্ষম।
ওজোন স্তর ধ্বংসের ক্ষতিকর প্রভাব
- অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের কোষের DNA-এর ক্ষতি করতে পারে এবং Sunburn ও ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
- চোখে ছানি বা Cataract-এর মতো সমস্যা বৃদ্ধি পেতে পারে।
- সমুদ্রের ফাইটোপ্ল্যাংকটনের ক্ষতি হতে পারে, যা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
- উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয়ে বৃদ্ধির হার কমতে পারে।
পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
- ওজোন স্তর কীভাবে তৈরি হয়?
- ওজোন স্তরের ঘনত্ব কোন এককে মাপা হয়?
- ওজোন স্তরের অবক্ষয় বলতে কী বোঝ?
- CFC কীভাবে ওজোন স্তরের ক্ষতি করে?
- NO ও NO₂ কীভাবে ওজোনকে ধ্বংস করে?
- চক্রাকার বা Catalytic Reaction কী?
- ওজোন স্তর ধ্বংসের দুটি ক্ষতিকর প্রভাব লেখো।
পরবর্তী Lesson: গ্রিনহাউস এফেক্ট ও বিশ্ব উষ্ণায়ন